ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। আমার জীবনে ঈদ এসেছে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে। ছোট বেলার ঈদ, বেকার জীবনের ঈদ আর এখনকার ঈদের মধ্যে বেশ বেশ ফারাক। ছোট বেলা আমার ঈদ কেটেছে আমার গ্রামের বাড়ি পাইকগাছার চাদখালীতে আমার দাদা দাদীর সাথে। খুলনার নতুন বাজার বা ৪ নম্বর ঘাট থেকে দুপুর ১টার লঞ্চে বাড়ি যাওয়া, যদি কখনো নতুন কাপড় পাওয়া যেত, সে কী আনন্দ। ঐ নতুন কাপড় কাউকে না দেখানো। দাদার হাত ধরে কালাম বাগানে ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া। ঈদের নামাজ পড়ার পর বড়দের কাছ থেকে সেলামি নেওয়া, বেলুন কেনা ইত্যাদি। এগুলো এখনো আমাকে নাড়া দেয়।
এসএসসি পাস করার পর আমার ঈদের আনন্দের অনেকটা পরিবর্তন আসে। আমি ছোট বেলা থেকে রাজনীতি সচেতন। আমি দেশভাগের ইতিহাস জানতাম। হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা জানতাম। হাজী শরীয়তউল্লাহ ও শহিদ তিতুমীরের সংগ্রামের কথা জানতাম। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানতাম। ভারতীয় কংগ্রেসের ইতিহাস এবং পরবর্তীতে মুসলিম লীগের জন্মের ইতিহাস জেনেছি। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ এবং খুলনাকে ভারতের মধ্যে নেয়ার কথা জেনেছি। পরবর্তীতে খুলনা কীভাবে পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের মধ্যে আসলো সেটাও জেনেছি। জেনেছি আমার মরহুম আব্বা সাহিত্যিক শেখ আবদুল জলিলের কাছ থেকে এবং বই পড়ে। (বলে রাখা ভালো আমার যে কয়টি নেশা আছে তার মধ্যে অন্যতম বই পড়া এবং পৃথিবীর মুসলিম ইতিহাস জানা)।
যা হোক আসল কথায় ফিরে আসি। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি উপমহাদেশ তথা আফ্রো – এশিয়ার সংসদীয় রাজনীতির অন্যতম পুরুষ মরহুম খান এ সবুর সাহেবের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়। খান এ সবুর তখন বাংলাদেশের জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আমিও কলেজ জীবনে প্রবেশ করেছি। সবুর খানের সঙ্গে জড়িত হওয়ার পর জানলাম তিনি যখন পাকিস্তান সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন তখন এবং তার আগে ও পরে সবসময় ১৪ আগস্ট এবং দুই ঈদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিনে করাচি, ইসলামাবাদ এবং ঢাকা থেকে খুলনায় আসতেন আর খুলনার মানুষের সঙ্গে সময় দিতেন। দলমত নির্বিশেষে খুলনার মানুষ ছিল তার আপনজন। তারই ধারাবাহিকতায় শেষ জীবনে দুই ঈদ তিনি খুলনায় তার বাড়ি সবুর লজের সামনে সার্কিট হাউস ময়দানে পড়েছেন। আমিও সকাল সাতটার মধ্যে সবুর খানের বাড়ি চলে আসতাম। তারপর অন্য নেতাদের সঙ্গে একসাথে সবুর খানের সাথে সার্কিট হাউস ময়দানে দুই ঈদের নামায় পড়েছি মরহুম নেতার মৃত্যুর আগ অবধি। সকালে ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে খান এ সবুর বাবুর্চিদের নিকট থেকে খবর নিতেন বিরিয়ানি বা পোলাও, সিমাইসহ অন্য খাবার রান্না হয়ে গেছে কিনা। তিনি বিশেষভাবে জানতে চাইতেন খাশীর বিরিয়ানি বা মাংস রান্না শেষ হয়েছে কিনা। কারণ যেসব হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ঈদের দিন তার বাড়ি আসবেন আর যাতে কেউ না খেয়ে যান। এভাবে আমার কেটে গেল নেতার ইন্তেকালের পূর্ব অবধি।
আর চাঁদখালী যাওয়া হয় না। আমিও লেখাপড়া শেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশন সংবাদ বিভাগে খুলনা সংবাদদাতা হিসেবে যোগদান করেছি। সুতরাং ঈদের জামাতের খবর ভিডিও সহ কভার করার জন্য সার্কিট হাউস ময়দানে নামাজ পড়া অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়ে গেল।
গত দুই বছর বাদে ১৯৭৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আমি, আমার মরহুম আব্বা (বেঁচে থাকা অবধি) আমার ছোট ভাই ও আমার একমাত্র সন্তান সার্কিট হাউস ময়দানে নামাজ পড়েছি। এখন যেহেতু আমি প্রান্তিকা জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি তাই আমাকে প্রান্তিকায় নতুন ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়তে হয়।
সার্কিট হাউস মাঠে ঈদের নামাজ পড়তে গিয়ে আমি যাদের কাছে খুব বেশি প্রিয় হয়ে উঠেছিলাম তাদের মধ্যে জাতীয় পার্টির মন্ত্রী কর্নেল গফফার, সাবেক মেয়র কাজী আমিন, সাবেক প্রাদেশিক মন্ত্রী আমজাদ হোসেন, সাবেক মেয়র সিরাজুল ইসলাম, সাবেক পৌরসভার চেয়ারম্যান গাজী শহীদুল্লাহ্, ভাইস চেয়ারম্যান আবুল হাসান, সাবেক মেয়র মরহুম শেখ তৈয়েবুর রহমান, সাবেক স্পীকার শেখ রাজ্জাক আলী, সাবেক হুইপ আশরাফ হোসেন, সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম দাদু ভাই, সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক, বন্ধু সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মনজু প্রমুখ। তখন আজকের মত ঢাকায় ভিডিও পাঠানো খুব একটা সহজ ছিল না। কোন কোন সময় বিটিভির ক্যামেরাপার্সন নাসির মাহমুদ বা কাজী রফিক, আবার কখনো স্থানীয় কচি বা সাঈদ ভিডিও করে আমার হাতে ধরিয়ে দিতেন। আমি নিউজ লিখে ভিডিও প্যাক করে সকাল দশটায় খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্য যাওয়া সোহাগ পরিবহনে ধরিয়ে দিতাম। সোহাগ পরিবহনের হেলপার বিকেল ৪/৫টায় রামপুরা বিটিভি ভবনের পাহারারত দারোয়ানের কাছে ক্যাসেট পৌঁছে দিত। দারোয়ান ক্যাসেট বিটিভির নিউজ রুমে পাঠিয়ে দিত। আমিও বিকেল ৫টায় ক্যাসেট পেয়েছে কিনা ফোন করে খবর নিতাম এবং কেসিসি মার্কেট থেকে ফ্যাক্সের মাধ্যমে আবারও নিউজ পাঠাতাম। রাত আটটার সংবাদে খুলনার ঈদের জামাতের খবর প্রচার হওয়ার পর আমার টেনশন শেষ হতো। এরপর আমার ঈদের আনন্দ শুরু হতো।
যখন পরিবহন থাকতো না তখন গাড়ি নিয়ে অথবা মোটর সাইকেল নিয়ে যশোর বিমান বন্দরে গিয়ে দুপুরের বিমানে ক্যাসেট ধরিয়ে দিয়ে আবার খুলনায় ফিরে আসতাম। ঢাকা বিমান বন্দর থেকে টিভি কর্তৃপক্ষ ক্যাসেট সংগ্রহ করতেন। গাড়ি দিয়ে সহযোগিতা করতেন সাবেক মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমান এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা বন্ধু সরদার আবু তাহের।
এইসময় সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছি তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুক্তাদির চৌধুরী, কাজী রিয়াজুল হক, রেস্তাদুল ইসলাম, ফিরোজ আলম, জিয়াউর আলম সহ অনেকের।
তবে একটা ঘটনা এখনো আমাকে নাড়া দেয়। তখন খুলনার বিভাগীয় কমিশনার নাজমুল আলম সিদ্দিকী। যিনি পরবর্তীকালে বিটিভির মহাপরিচালক এবং তথ্য সচিব ছিলেন।
আমি খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে নামাজ পড়া শেষ করে কমিশনার সাহেবের সাথে কোলাকুলি করছি।
এই সময় আমার পকেট মার হয়। কিন্তু আমি কিছু না বোঝার আগেই কমিশনার নাজমুল আলম সিদ্দিকী পকেটমারকে ধরে ফেলেন।
ঈদের পরের দিন আমার কাটতো কয়েকজন জাতীয় নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলে, তখন মোবাইল তেমনভাবে আসেনি। জাতীয় নেতাদের মধ্যে এই তালিকায় কাজী জাফর আহমেদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ, সাংবাদিক নেতা গিয়াস কামাল চৌধুরী ও হাবীবুর রহমান মিলন ছিলেন অন্যতম।
ঈদের দিন নামাজ পড়ার পর আমার ভায়রা পিতৃতুল্য সাংবাদিক আশরাফ উদ্দীন মকবুল, বোন মিনু মমতাজ, সহকর্মী মুজাহিদ ভাইয়ের বাড়ি যাওয়া আমার ছিল নিত্য ব্যাপার।
আর আজকের প্রত্যাশা, নতুন সংসদ যাত্রা শুরু করেছে। যাত্রা শুভ হোক। এই কামনায় আজ শেষ করছি।
লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক খুলনা গেজেট ও খুলনা প্রতিনিধি, ইউএনবি।
খুলনা গেজেট/এনএম

